শেয়ার
করুন

ওয়েবসাইটি শেয়ার করুন

বাংলা ব্যাকরণে উপসর্গ ও প্রত্যয়: শব্দগঠনের মৌলিক ভিত্তি

February 08

বাংলা ব্যাকরণে উপসর্গ ও প্রত্যয়: শব্দগঠনের মৌলিক ভিত্তি

বাংলা ভাষা অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও গঠনগতভাবে সুসংহত একটি ভাষা। এই ভাষার শব্দভাণ্ডার কেবল মৌলিক শব্দের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং বিভিন্ন ব্যাকরণিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন নতুন শব্দ সৃষ্টি হয়। এই শব্দগঠন প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান উপাদান হলো উপসর্গ ও প্রত্যয়। বাংলা ব্যাকরণে এ দুটি বিষয় সঠিকভাবে না বুঝলে শব্দের অর্থ বিশ্লেষণ ও প্রয়োগে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। ভর্তি পরীক্ষা, বিসিএস এবং অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এই অধ্যায়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

যেসব বর্ণ বা বর্ণগুচ্ছ কোনো মূল শব্দের পূর্বে যুক্ত হয়ে শব্দের অর্থে নতুন মাত্রা যোগ করে বা অর্থের পরিবর্তন ঘটায়, সেগুলোকে উপসর্গ বলা হয়। উপসর্গ সাধারণত শব্দের মূল অর্থকে বিস্তৃত করে, সংকুচিত করে অথবা বিপরীত অর্থ প্রকাশ করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ‘দিন’ শব্দটির আগে ‘প্রতি’ যুক্ত হলে ‘প্রতিদিন’ শব্দটি গঠিত হয়, যার অর্থ হয় প্রত্যেক দিন। আবার ‘ভয়’ শব্দের আগে ‘নির্’ যুক্ত হয়ে ‘নির্ভয়’ শব্দ তৈরি করে, যা ভয়হীন অবস্থাকে বোঝায়। এসব ক্ষেত্রেই দেখা যায়, উপসর্গ মূল শব্দের আগে বসে তার অর্থ পরিবর্তন করেছে।

উপসর্গের শ্রেণিবিভাগ: বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত উপসর্গগুলো উৎসের দিক থেকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত। সংস্কৃত থেকে আগত উপসর্গগুলো বাংলায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। যেমন: প্র, অতি, নির্, সম্ ইত্যাদি। এছাড়া বাংলা নিজস্ব উপসর্গও রয়েছে, যেমন: অ, আ, বে। আধুনিক বাংলায় কিছু বিদেশি উপসর্গও ব্যবহৃত হচ্ছে, যা মূলত ইংরেজি ভাষা থেকে এসেছে; যেমন: সুপার, সাব, অ্যান্টি ইত্যাদি।

প্রত্যয়ের ধারণা: প্রত্যয় হলো সেই বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি, যা কোনো মূল শব্দের শেষে যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ তৈরি করে। প্রত্যয়ের মাধ্যমে শব্দের শ্রেণি পরিবর্তিত হতে পারে অথবা নতুন অর্থবোধক শব্দ সৃষ্টি হয়। উপসর্গ যেখানে মূলত অর্থের দিকটি প্রভাবিত করে, সেখানে প্রত্যয় শব্দগঠনের কাঠামোকে আরও বিস্তৃত করে। যেমন: ‘কবি’ শব্দের সঙ্গে ‘তা’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘কবিতা’ শব্দটি তৈরি হয়। আবার ‘শিক্ষা’ শব্দের সঙ্গে ‘ক’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘শিক্ষক’ শব্দ গঠিত হয়। এসব ক্ষেত্রে প্রত্যয় মূল শব্দের শেষে বসে একটি নতুন অর্থবোধক শব্দ তৈরি করেছে।

প্রত্যয়ের প্রকারভেদ: বাংলা ব্যাকরণে প্রত্যয়কে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়। কৃৎ প্রত্যয় ধাতুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে শব্দ গঠন করে এবং তদ্ধিত প্রত্যয় বিশেষ্য বা বিশেষণের সঙ্গে যুক্ত হয়। যেমন: ‘লিখ’ ধাতুর সঙ্গে ‘ক’ যুক্ত হয়ে ‘লেখক’ শব্দটি কৃৎ প্রত্যয়ের উদাহরণ। অন্যদিকে ‘গ্রাম’ শব্দের সঙ্গে ‘ই’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘গ্রামী’ শব্দটি তদ্ধিত প্রত্যয়ের উদাহরণ।

উপসর্গ ও প্রত্যয়ের পার্থক্য: উপসর্গ ও প্রত্যয়ের মধ্যে প্রধান পার্থক্য তাদের অবস্থান ও কার্যকারিতায়। উপসর্গ শব্দের আগে বসে মূল শব্দের অর্থে পরিবর্তন আনে, আর প্রত্যয় শব্দের পরে বসে নতুন শব্দ সৃষ্টি করে। এই পার্থক্যটি পরীক্ষার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অনেক সময় উপসর্গ ও প্রত্যয় চিহ্নিত করতে বলা হয়। উপসর্গ ও প্রত্যয় বাংলা ব্যাকরণে শব্দগঠনের অন্যতম ভিত্তি। এই দুটি বিষয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকলে শব্দের গঠন, অর্থ নির্ণয় এবং ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগ অনেক সহজ হয়ে যায়। শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের জন্য তাই উপসর্গ ও প্রত্যয় অধ্যায়টি গভীরভাবে অনুশীলন করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।