July 16
বাংলা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে যাঁদের অবদান চিরস্মরণীয়, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন অধ্যাপক আবুল কাশেম। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, চিন্তাবিদ, লেখক এবং ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক। মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে তিনি যে নেতৃত্ব, প্রজ্ঞা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
অধ্যাপক আবুল কাশেম ১৯২০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে অধ্যয়ন করেন এবং পরবর্তীতে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনার বিকাশে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর যখন উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখন অধ্যাপক আবুল কাশেম এর তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, বাংলা ভাষাকে অবমূল্যায়ন করা হলে বাঙালির সাংস্কৃতিক ও জাতীয় পরিচয় হুমকির মুখে পড়বে। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিশ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনটি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিকে সংগঠিত ও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অধ্যাপক আবুল কাশেম ভাষা আন্দোলনের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে বিভিন্ন প্রবন্ধ, পুস্তিকা ও সভা-সমাবেশের মাধ্যমে নিরলসভাবে কাজ করেন। তাঁর লেখা "পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা: বাংলা না উর্দু?" শীর্ষক পুস্তিকাটি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। এই লেখার মাধ্যমে তিনি যুক্তি ও তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তুলে ধরেন। ভাষা আন্দোলনের পাশাপাশি তিনি শিক্ষা, সাহিত্য ও সমাজ উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মাতৃভাষায় শিক্ষা জাতির মেধা ও সৃজনশীলতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই তিনি বাংলা ভাষায় উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার প্রসারে কাজ করেছেন।
অধ্যাপক আবুল কাশেমের অবদান কেবল ভাষা আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তিনি বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর আদর্শ, চিন্তাধারা এবং কর্ম আজও নতুন প্রজন্মকে ভাষা, সংস্কৃতি ও দেশের প্রতি দায়িত্বশীল হতে অনুপ্রাণিত করে। সবশেষে বলা যায়, অধ্যাপক আবুল কাশেম ছিলেন একুশের চেতনার অন্যতম অগ্রদূত। ভাষা আন্দোলনে তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাঁর অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।