শেয়ার
করুন

ওয়েবসাইটি শেয়ার করুন

কবর – মুনীর চৌধুরীর চেতনার অমর নাটক

October 19

কবর – মুনীর চৌধুরীর চেতনার অমর নাটক

বাংলা নাট্যসাহিত্যে “কবর” একটি অনন্য সৃষ্টি। এটি কেবল একটি নাটক নয়, বরং এক সময়ের প্রতিবাদ ও মানবিক চেতনার প্রতিধ্বনি। নাটকটি রচনা করেছিলেন মুনীর চৌধুরী, যিনি ছিলেন বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট নাট্যকার, শিক্ষাবিদ, ভাষাসৈনিক এবং শহীদ বুদ্ধিজীবী। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি কারাবন্দি ছিলেন, আর সেই বন্দিশালার মধ্যেই তিনি রচনা করেন “কবর” নাটকটি। এই নাটক তাই শুধু সাহিত্যকর্ম নয়, বরং এক বন্দিশালার অন্ধকার থেকে উদ্ভূত স্বাধীনতার আলোকবার্তা। মুনীর চৌধুরী ১৯২৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। সাহিত্যের পাশাপাশি তিনি ছিলেন সমাজ সচেতন একজন মানুষ, যিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছিলেন সারাজীবন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে হত্যা করে, আর তিনি শহীদ বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম হয়ে ওঠেন। তাঁর “কবর” নাটকটি সেই প্রতিবাদী মননেরই এক চিরন্তন নিদর্শন।

“কবর” নাটকের কাহিনি এক গভীর প্রতীকের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এখানে কবর কেবল মৃত্যুস্থান নয়, বরং নিপীড়ন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের অদম্য চেতনার প্রতীক। নাটকের চরিত্ররা মৃত্যুর পরও কথা বলে, তারা সমাজের নিষ্ঠুর বাস্তবতা, ভয় ও নিস্তব্ধতার মাঝেও সত্যের পক্ষে উচ্চারণ তোলে। জীবিতরা যেখানে নীরব, মৃতরা সেখানে কথা বলে—এই বৈপরীত্যই নাটকের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক। এটি প্রমাণ করে যে সত্য ও ন্যায়ের কণ্ঠস্বর কখনও সম্পূর্ণরূপে দমন করা যায় না। নাটকের ভাষা সরল হলেও তার গভীরতা অত্যন্ত প্রবল। প্রতিটি সংলাপেই রয়েছে তীব্র সামাজিক বার্তা ও দার্শনিক ভাবনা। কারাগারের দেয়াল পেরিয়ে এই নাটক বাঙালি সমাজে জাগিয়ে তোলে প্রতিবাদের নতুন স্পন্দন। মৃত্যুর মধ্যেও জীবনের আহ্বান, অন্ধকারের ভেতরেও আলোর সন্ধান — এই দুটি ভাবই নাটকটির মর্মকথা।

“কবর” আজও সমান প্রাসঙ্গিক, কারণ এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ। এটি শেখায় যে অন্যায়, দমন, ও ভয় যতই শক্তিশালী হোক না কেন, মানুষের চেতনা ও ন্যায়বোধ কখনও কবরের নিচে চাপা পড়ে না। মুনীর চৌধুরীর এই অমর সৃষ্টি তাই একদিকে সাহিত্য, অন্যদিকে জাতিসত্তার মুক্তি ও মানবতার প্রতি অঙ্গীকারের প্রতীক।