শেয়ার
করুন

ওয়েবসাইটি শেয়ার করুন

রক্তকরবী — প্রেম, বিদ্রোহ ও মানবতার নাটক

October 09

রক্তকরবী — প্রেম, বিদ্রোহ ও মানবতার নাটক

বাংলা নাটকের ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক অনন্য নাম। তাঁর রচিত ‘রক্তকরবী’ শুধু একটি নাটক নয়, বরং মানুষের মুক্তি, ভালোবাসা ও মানবিকতার এক শাশ্বত প্রতীক। ১৯২৩ সালে লেখা এই নাটকটির প্রাথমিক নাম ছিল “যক্ষপুরী”। পরে তা পরিবর্তন করে রাখা হয় “রক্তকরবী” — একটি লাল ফুলের নামে, যা প্রতীক হয়ে ওঠে জীবনের প্রাণশক্তি, ভালোবাসা ও প্রতিবাদের।

নাটকটির প্রেক্ষাপট এক কল্পিত শহর “যক্ষপুরী”, যেখানে সোনা উত্তোলনের জন্য শ্রমিকদের অমানবিকভাবে খাটানো হয়। রাজা ও তার অনুচররা অদৃশ্যভাবে এই শোষণ চালিয়ে যায়, যেন মানুষ সেখানে যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। সেই যন্ত্রনগরীতে একদিন আসে নন্দিনী—এক তরুণী, যার হাতে রক্তকরবীর ফুল। সে ভালোবাসা, স্বাধীনতা ও মানবিকতার প্রতীক। তার উপস্থিতিতে নিস্তব্ধ রাজ্যের দেয়াল কেঁপে ওঠে; সে যেন জীবনের প্রাণসঞ্চার ঘটায় মৃতপ্রায় মানুষদের মধ্যে। নন্দিনীর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন মানুষের চিরন্তন তৃষ্ণার কথা—মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, ভালোবাসার দাবি, এবং জীবনের সৌন্দর্যের অন্বেষা। নাটকের প্রতিটি সংলাপই যেন সমাজের যান্ত্রিক বাস্তবতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। রাজা শেষ পর্যন্ত নিজের অমানবিক অস্তিত্বকে চিনতে শেখে, আর যক্ষপুরী ফিরে পায় মানবিকতার আলো।

‘রক্তকরবী’ শুধু রাজা-প্রজা বা শোষক-শোষিতের গল্প নয়। এটি এমন এক দর্শন, যা আজও আমাদের বর্তমান পৃথিবীতে প্রাসঙ্গিক। আজও মানুষ অর্থের দাস, প্রযুক্তির যন্ত্র, আর নন্দিনীর মতো কিছু মানুষ চেষ্টা করে সেই যন্ত্রজীবনে প্রাণ ফেরাতে। নাটকটি শেখায়, প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে মানবিক ভালোবাসায়, মুক্ত চিন্তায় এবং সাহসী প্রতিবাদে। রবীন্দ্রনাথ এই নাটকের মাধ্যমে বলতে চেয়েছেন—মানুষের জীবন কেবল শ্রম বা ভোগের জন্য নয়, তার ভেতরে আছে এক অদম্য সৃষ্টিশক্তি, যা ভালোবাসা ও স্বাধীনতার মধ্যে প্রকাশ পায়। রক্তকরবী তাই কেবল একটি নাটক নয়, এটি এক চেতনা—যা প্রতিটি যুগে মানুষকে মুক্তির স্বপ্ন দেখায়।