November 13
বাংলার ইতিহাসে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বা ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষ এক ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক ঘটনা। এটি শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং মানুষের অমানবিকতা, লোভ, এবং শাসনব্যবস্থার অদক্ষতার এক নির্মম দলিল। ইতিহাস ও সাহিত্য—উভয় ক্ষেত্রেই এই মন্বন্তর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ১৭৭০ সালে (বাংলা ১১৭৬/ছিয়াত্তর সাল), ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনাধীন বাংলায় দেখা দেয় এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। তীব্র খরা ও বন্যার কারণে ধানসহ অন্যান্য ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু কোম্পানির কর আদায় বন্ধ হয়নি—চাষিদের কাছ থেকে জোর করে খাজনা আদায় করা চলতেই থাকে। ফলস্বরূপ, খাদ্যের অভাব মারাত্মক রূপ নেয়। লক্ষ লক্ষ মানুষ অনাহারে, রোগে, ও ক্লান্তিতে মারা যায়। ইতিহাসবিদদের মতে, এই দুর্ভিক্ষে বাংলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা বিলুপ্ত হয়েছিল।
এই দুর্ভিক্ষে শুধু মানুষের মৃত্যু নয়, সমাজের মূল্যবোধও ভেঙে পড়ে। অনেক পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়, চাষিরা জমি হারিয়ে ভিক্ষুক হয়ে পড়ে। শহরের বাজারে মৃতদেহের স্তুপ, অনাহারী শিশু, ও অসহায় নারীদের আর্তনাদ—এসব ছিল সেই সময়ের করুণ বাস্তবতা। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর কেবল অর্থনৈতিক বিপর্যয়ই নয়, এটি ছিল এক মানবিক ট্র্যাজেডি, যেখানে লোভ, অন্যায় শাসন, এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মিলেমিশে এক মৃত্যুর মিছিল সৃষ্টি করেছিল।
এই ঘটনাটি বাংলা সাহিত্যে গভীর প্রভাব ফেলেছে। মণীষী নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস “ছিয়াত্তরের মন্বন্তর” এই দুর্ভিক্ষের হৃদয়বিদারক চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। উপন্যাসে দেখা যায় কীভাবে সাধারণ মানুষ, বিশেষত কৃষক সমাজ, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের চেয়ে অনেক বেশি কষ্ট পেয়েছিল শাসকদের অবহেলা ও শোষণে। এই উপন্যাস শুধু ইতিহাসের দলিল নয়—এটি এক গভীর মানবিক প্রতিবাদ, যেখানে লেখক মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামকে তুলে ধরেছেন।
ছিয়াত্তরের মন্বন্তর আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রাকৃতিক বিপর্যয় যত ভয়াবহই হোক না কেন, মানুষের অন্যায় ও স্বার্থপরতা তার থেকেও বেশি ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। ইতিহাসের এই অধ্যায় মানবতার এক কঠিন পরীক্ষা ছিল। আর বাংলা সাহিত্যে এটি এক অনন্ত প্রেরণা—অন্যায়ের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তোলার, এবং মানুষ ও মানবিকতার পাশে দাঁড়ানোর।
October 19